পঁচিশতম অধ্যায়: অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি
বিদ অরণ্যের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে হাঁটছিল, ম্লান চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে, সামনে পথটিকে আলোকিত করছে।
তবে একে পথ বলা একটু বাড়াবাড়ি, আসলে এ তো নিছকই অনাবৃত, খসখসে কাদা-মাটি।
দৃষ্টিসীমার যতটুকু জুড়ে, শুধু ফাঁকা, নিস্তব্ধতা আর শূন্যতার আধিপত্য।
এটা অবশ্য খারাপ নয়, ঘন ঝোপঝাড় না থাকলে বিষাক্ত সাপ কিংবা কীটপতঙ্গের আশঙ্কাও নেই।
শুধু একটু সাবধানে হাঁটলেই হয়, যেন বড় গর্ত কিংবা দমে যাওয়া বালিতে পা না পড়ে; সমতল রাজপথের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়।
এ ধরনের পথ চলার জন্য, এটি বরং আশীর্বাদ।
বিদ তো আর বেড়াতে আসেনি, তার পাখির গান, ফুলের সুবাস কিংবা নীল আকাশের কোনো শখ নেই।
তবু, এখানে চলার সময় দুটি বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখা জরুরি।
প্রথমত: দিক ভালোভাবে মনে রাখা। এখানে চারপাশের দৃশ্য একরকম, পথ হারিয়ে ফেললে বড় বিপদ।
বিদ এমন অভিজ্ঞতা পেয়েছে—ধুলোয় চাঁদ ঢাকা পড়লে সে একেবারে দিক ভুলে যায়, তখন সে যেন দিগ্বিদিক জ্ঞানহীন কোন পতঙ্গ, এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করে।
নতুন গুহা বানানোর আগে, তার একটি সাময়িক বিশ্রামের ছোট গর্ত ছিল, কিন্তু সেদিন সে ফিরতি পথ খুঁজে পায়নি, অবশেষে একটি উঁচু মাটির ঢিবির পাশে গিয়ে ঘুমিয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতার পর, সে আশপাশের অপ্রচলিত স্থানগুলোকে চিহ্নিত করে রেখেছে দিকনির্ধারণের জন্য।
সে কেবল পরিচিত এলাকায় বিচরণ করে, অজানা পথে পা বাড়ায় না—ফলে চাঁদ ঢেকে গেলেও সে বুঝতে পারে কোথায় আছে, পথ হারায় না।
দ্বিতীয়ত: সাবধান হতে হয় ঘুরে বেড়ানো কঙ্কালদের থেকে।
আসলে তাদের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, এই অরণ্য এত বিশাল—শেষ নেই, প্রান্ত নেই; অনেক কঙ্কাল থাকলেও তারা এত ছড়িয়ে আছে যে, দেখা পাওয়া কঠিন।
আর কিছুদিন আগেই ঝড় বয়ে গিয়েছিল, মনে হয় সেই ঝড় কঙ্কালদের আরেকদিকে উড়িয়ে দিয়েছে—তারা যেন বাতাসে ভেসে যাওয়া শুকনো ঘাসের মতো।
আজ বিদ যখন বের হয়েছে, আশপাশে কোনো কঙ্কাল চোখে পড়েনি।
দূর পর্যন্ত দৃষ্টি মেলে শুধু অরণ্য, অরণ্য আর অরণ্য।
আজ মনে হয় না কোনো কঙ্কাল-ভ্রাতা হাত তুলে তার দিকে ছুটে আসবে, তবু বিদ মিয়াকে কাছেই ডাকল, যেন সে বেশিদূর না যায়।
গুহা থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছে তারা, অচেনা পরিবেশে সতর্কতাই শ্রেয়।
মিয়ার ভ্রমণের উচ্ছ্বাস অনেকটা কমে এসেছে, সে এখন বিদের কাঁধে বসে আছে, আর উড়ে বেড়াচ্ছে না।
বিদ মনোযোগ ধরে রেখে এগোতে থাকল। অরণ্যে কোনো বাধা নেই, দৃষ্টি প্রশস্ত, এর মানে সে যেমন অন্য কিছু দেখতে পারে, তেমন অন্য কিছু তাকে দেখতে পারে।
নিভৃতপ্রায় জায়গাটিও হয়তো বিপদের সম্ভাবনায় ভরা।
ভাগ্য ভালো, বিদ নির্বিঘ্নেই গন্তব্যে পৌঁছে গেল।
সে হাঁটা থামাল, সামনে দুই প্রান্তে ঘেরা একটি উপত্যকা, মাথার ওপর বিশাল এক গুঁড়ির মতো কাঁটার ঝোপ বেঁকে সেতুর মতো ঝুলে আছে—ওটা এতই বড় যে, পুরোটা দেখতে মাথা তুলে তাকাতে হয়।
ওটা যেন বিশাল এক সেতু, খাদ পেরিয়ে একদিকের মাটি থেকে বেঁকে আরেক দিকে পৌঁছেছে।
ঝোপের গায়ে ধূসর-বাদামি আবরণ, গাছের ছালের মতো ভাঁজ, একেকটি কাঁটা বাইরে উঠে আছে, প্রতিটি কাঁটা যেন ছোট্ট ঘর।
এত বড় কাঁটার গাছ বিদ শুধু এই ঝোপের কাছেই দেখেছে, কে জানে কত বছর ধরে ওরা বেড়ে উঠেছে—আদিম বনজ গাছের চেয়েও বড়, চেয়েও প্রাচীন।
এত দানবাকৃতি কাঁটা বিদ শুধু দৃশ্য উপভোগের জন্যই দেখে; তার লক্ষ্য অন্য, ছোট ছোট কাঁটা ডাল—যেগুলো তার হাতের হাড়ের মতো মোটা, আর একটু চিকন হলেও চলে, তবে বড় হলে ঝামেলা।
আরও একটু সামনে এগোতেই ছোট ছোট কাঁটার ডাল চোখে পড়ল, ওগুলো এত বড় নয় যে উপত্যকা পেরোতে পারে, তাই অন্য জায়গায় জন্মেছে।
বিদ ঢাল বেয়ে উঠে উচ্চস্থানে এল, চোখ মেলে দেখল—জালে জড়ানো কাঁটা ডাল এক অদ্ভুত চিত্র এঁকেছে; বিশাল কাঁটাগুলো যেন গাছের শিকড়ের মতো জটিলভাবে ছড়িয়ে-মিশে গেছে, মাঝেমধ্যে ফাঁকা, কোথাও বা পাখির খাঁচার মতো, কোথাও বা বেঁকে গেছে লম্বা বর্শার মতো।
ওদের পাশে বিদ যেন এক বিন্দু ধুলিকণার মতো ক্ষুদ্র—চাইলেই কাঁটার ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে।
এ প্রথম নয়, তবুও বিদের মনে হয় যেন সে প্রাচীন কালের কোনো অরণ্যে ঢুকে পড়েছে—শুধু গাছের বদলে এখানে একটাই উদ্ভিদ, তাই একটু একঘেয়ে, কিন্তু ঠিক এজন্যই দৃশ্যটা স্মরণীয়।
প্রান্তে কিছু উপকরণ পেলেই চলবে।
বিদ ভিতরে ঢোকার কথা ভাবল না—ভেতরটা অনেক বড়, জমি জটিল, যদি পা পিছলে পড়ে যায়, প্রাণে বাঁচলেও বেরোতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে।
তার চেয়েও বড় কথা, ভেতরে অন্য কিছু লুকিয়ে থাকতে পারে।
সে তো কেবল গুহা মজবুত করার উপকরণ খুঁজতে এসেছে, কোনো দুঃসাহসী অভিযাত্রী বা পণ্ডিত নয় যে, এই সব রহস্যের পেছনে ছুটবে।
সে উপত্যকার খাড়া দেয়ালে ভাঙা কাঁটা খুঁজছিল, বেশি দূর না যেতেই প্রয়োজনমতো একটা পেল—মোটামুটি এক মিটার লম্বা, ভাঙা মুখে বালু-ঝড়ের ক্ষতের চিহ্ন, ফাটলটা খসখসে, অনিয়মিত, বোঝা যায় প্রাকৃতিকভাবে ভেঙেছে।
ক্ষয়ের দিক দেখে অনুমান করা যায়, এটা গত দুই-একদিনেই পড়েছে—অনেক আগেই ক্ষয় শুরু হয়েছিল, বরফের মতো ফাটল ধরেছিল।
সেদিনকার ঝড়ে শেষ ঠেলা পেয়েছে, এই অংশটা পুরো ঝোপের প্রান্তে, তাই বড় কোনো কাঁটা ওটাকে রক্ষা করতে পারেনি—অবধারিতভাবেই ভেঙে পড়েছে।
এ ধরনের কাঁটা গাছ সহজে ভাঙে না, ওরা খুবই মজবুত, তবে এত ঘনবসতি যে, কিছু না কিছু দুর্বল ডাল ঝড়ে ভেঙে পড়বেই।
বিদ কাঠ কুড়োনোর মতো ভাঙা কাঁটা ডালগুলো তুলে নিতে লাগল। খাদে তাকিয়ে দেখে, অনেক ভাঙা ডাল নীচে পড়ে আছে—ধুলোর পর্দা সরালে সামান্য দেখা যায়, আবার ঝড় উঠলে বালু সেগুলো ঢেকে দেবে; এই খাদ যেন প্রাকৃতিক সমাধিক্ষেত্র, যেখানে ওরা চিরশয়ানে।
বিদের জন্য এ এক সুযোগ—ঠিক সময়ে এসেছে সে, শুধু ঝড়ের পরেই এত ভাঙা ডাল পাওয়া যায়, আগেরবার এসেছিল, কিছুই পায়নি, আর দেরি করলে এবারও বালুর নিচে চাপা পড়ে যেত।
সে বেশ সহজেই উপযুক্ত মোটা-চিকন, লম্বা কাঁটা ডালের একগুচ্ছ জোগাড় করল।
কোমরের কাপড় খুলে ডালগুলো বেঁধে নিল, যেন কাঠের বোঝা পিঠে তুলে নিল।
ভাগ্যিস সে কঙ্কাল, নইলে জীবিত কেউ হলে, কাঁটার ছোট ছোট ফোঁড়ায় জামাকাপড় ছিঁড়ে রক্তাক্ত হয়ে যেত।
এবার ফেরার পালা, বিদ ভাবল।
কিন্তু হঠাৎ মিয়া কোথাও উড়ে গেল, বিদ অবাক; মিয়া তার মনে কথা পাঠাল—সে খেতে চায়।
এখানে কিছু খাওয়ার আছে নাকি?
বিদ ওকে ডাকল, মিয়া অনুভবে জানাল—অদূরেই কিছু আছে, ওই বিশাল কাঁটার নিচে।
দূর নয়, বড়জোর কয়েক ডজন গজ।
একটু ভেবে বিদও গেল, কাঁটা ডালগুলো রেখে, হাতুড়ি বের করল, ঢাল তুলল, মিয়াকে আধা মিটারের মধ্যে পথ দেখাতে বলল।
বিদ মাথা নিচু করে ছায়ার মধ্যে যেতেই দেখতে পেল—কিছু একটা আলো ছড়াচ্ছে; ছোট্ট এক ঝাঁক উজ্জ্বল শৈবাল, বিশাল কাঁটার ফাঁকে জন্মেছে।
শৈবালের পাশে বিদ দেখতে পেল এক জোড়া পচা কঙ্কাল।
কঙ্কালটি আশ্চর্যজনকভাবে পোশাক পরা—ধূসর-সবুজ রঙে বিবর্ণ এক লিনেনের চাদর, হাতা আর নিচের ছেঁড়া প্রান্তে সাদা ছত্রাক গজিয়েছে।
কঙ্কালের কোমরে বিদ তিনটি ঝোলানো থলি দেখল, থলির মুখ থেকে সূক্ষ্ম শিকড় বেরিয়ে কঙ্কালের পাঁজরের ফাঁকে ঢুকে গেছে।
এমনকি তার পায়েও আছে একজোড়া জুতো, যেন ছাল আর শৈবাল চাপা দিয়ে বানানো মোটা জুতো।