পঞ্চান্নতম অধ্যায় রূপালি চাঁদের পরীর কাহিনী
সত্যিকারের জাদু হলো এক বিস্ময়, যা সাধারণ নিয়মের বিপরীতে ঘটে…
ভিড এই কথাটি নিয়ে ভাবছিল। সে নিজের কথা মনে করল—যে ছেলেটি মরুভূমির গুহায় ঘুমিয়ে পড়েছিল, এখন সে বসে আছে বুড়ো ইয়র্কের ঠিক সামনাসামনি, এটাই কি এক ধরনের বিস্ময় নয়?
সেই ব্যক্তি, যার মৃত্যু ঘটেছিল, মৃতের পরেও যার চেতনা ও স্মৃতি অক্ষুণ্ন রইল, এটাই বা আরেকটি বিস্ময় নয় কি?
যা কিছু সে এখন অভিজ্ঞতা করছে, তাই তো প্রকৃতপক্ষে বিস্ময়েরই নামান্তর।
রক্তিম বিদ্যানিকেতন, রক্তিম পণ্ডিত…
সেই ফাঁকা দশ বছরে, তার জীবনে আসলে কী ঘটেছিল? নাকি আরও অনেক আগেই, সে কোনো রহস্যময় শক্তির সংস্পর্শ পেয়েছিল, অথচ সে নিজেই তা জানতে পারেনি?
ভেতরে ভেতরে সে এই গুপ্ত জাদুশাস্ত্রের শাখাটির কথা মনে রাখল। সত্য-মিথ্যা যাই হোক না কেন, ওটা যে বিশফলকের সাথে কোনো না কোনো যোগ আছে, তা বেশ বোঝা যায়।
ভবিষ্যতে যদি সে অন্য কোথাও এ-জাতীয় রহস্যময় পণ্ডিতদের চিহ্ন পায়, তখন অনুসন্ধান ও সংযোগের চেষ্টা করা যাবে।
বুড়ো ইয়র্কও বুঝি শুধু কিছু কিংবদন্তির গল্পমাত্র পড়েছে, অস্পষ্ট বর্ণনা ছাড়া আর বিশেষ কিছু জানে না।
ভিড আর জিজ্ঞাসাবাদ করল না, এবার সে গবলিনটিকে দেখাল উড়ন্ত পাখি ও ফুলের মালার অলংকরণ।
বুড়ো ইয়র্ক এবার খুব বেশি সময় নিল না—দুই-তিনবার দেখে বলল, ‘‘এটা লম্বা-কানের পরীরাই সাধারণত ব্যবহার করে, তবে ইয়র্ক যা দেখেছে, তার চেয়ে অনেক সরল, হয়তো আরও প্রাচীন পরী সংস্কৃতি থেকে এসেছে।’’
‘‘তুমি কোথায় দেখেছিলে এই দুটি চিহ্ন?’’
‘‘একটি পোশাকে।’’ ভিড লিখল, ‘‘সাদা পোশাক, বুকে পাখি ও ফুলের মালার অলংকরণ।’’
‘‘তুমি কি সেই পোশাকের আকৃতি একবার এঁকে দেখাতে পারবে?’’ বুড়ো ইয়র্ক জানতে চাইল।
ভিড মাথা নেড়ে রাজি হল, আরেকটি খসড়া কাগজ নিল।
ওই পোশাকটি আঁকা বেশ সহজ, বিশেষ কোনো অলংকার ছিল না—অত্যন্ত সাধারণ এক পোশাক।
পোশাক ছাড়াও, ভিড সাজিয়ে নিল মৃতদেহের কোমরের ঝোলানো বীজের থলে, আর সেই ভাঙা জাদুদণ্ডটি কেমন ছিল, তারও রূপ দিল, পাশাপাশি সবুজ রঙের জাদুময় আংটি।
তবে এখানে কোনো রঙ ছিল না, তাই সে কেবল মোটামুটি ধারণা এঁকে দেখাল।
‘‘জাদুদণ্ড, আংটি, বীজের থলে, পাখি ও ফুলের মালা খচিত পোশাক...’’ বুড়ো ইয়র্ক কাগজে লিখে নিল মূল বৈশিষ্ট্যগুলি, মোটা ছোট আঙুল দিয়ে পাথরের টেবিলে আলতো চাপ দিল।
‘‘পা-ছাড়া পাখি... ফুলের মালা...’’ বুড়ো ইয়র্ক বিড়বিড় করল, ‘‘এটা সম্ভবত পুরোহিতের প্রতীক, পরীদের মধ্যে যারা পূজা করে, তাদের পোশাক অত্যন্ত সহজ-সরল হতে হয়।
‘‘সাদা পোশাক মানে নিজের সবকিছু উৎসর্গ করা, সোনার সুতোয় পাখি ও ফুলের মালা মানে সেবার দেবতার প্রতি শ্রদ্ধা ও আচার।
‘‘জাদুদণ্ড ও আংটি মানে মর্যাদা, অন্তত পাঁচ-চক্রের উপর একজন পরী পুরোহিত।
‘‘কিন্তু বীজের থলে... এর অর্থ কী?’’ বুড়ো ইয়র্ক আবার কপাল কুঁচকালো, ‘‘তুমি তো এক তরবারিধারী যোদ্ধা, এমন অদ্ভুত প্রশ্ন কেন করছো ইয়র্কের কাছে? তুমি কি তবে প্রত্নতাত্ত্বিক হবার স্বপ্ন দেখ?’’
গবলিন কিছুটা বিপাকে পড়ল, তরবারি ছাড়া ভিডের সব প্রশ্নই বেশ কঠিন।
যদি গবলিনকে ভাড়া করতে হতো, তাহলে সে হয়তো এখনই চেঁচিয়ে বাড়তি মজুরি চাইত।
ভিড ভাবল, গবলিন বলছে টাকা নেবে না, কিন্তু সে কি সত্যিই বিনামূল্যে সব নেবে?
সে রুপার মুদ্রাভরা থলেটা বের করে, গবলিনের সামনে এগিয়ে দিল।
টাকার প্রতি তার তেমন মোহ নেই, যদি এ অর্থে উত্তর পাওয়া যায়, তাহলে যথার্থ খরচই হবে।
‘‘তুমি এ কী করছো!’’ গবলিন বরং মুখ ভার করল, ‘‘ইয়র্ক তো বলেছে বিনামূল্যে জানাবে, তাহলে টাকাটা ফেরাও!’’
ভিড আবার থলে এগিয়ে দিল। পাহারাদাররা এমনই, প্রথমে ফিরিয়ে দেয়, দ্বিতীয় বারে বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান, তৃতীয়বারে পকেটে পুরে নেয়, বলে, ‘‘তোমার কাজটা করা যাবে।’’
কিন্তু গবলিন সত্যিই কথা রাখে। ভিড জেদ ধরে থলে বাড়িয়ে দিতেই, সে গলা লাল করে, চোখ বড় বড় করে থলেটা ঠেলে ফেরত দিল।
‘‘টাকা ফেরাও, ইয়র্ক বলেছে বিনামূল্যে জানাবে!’’ বুড়ো ইয়র্ক বলল।
ভিড তখন বুঝতে পারল, নিজের আচরণে গবলিনের মর্যাদায় আঘাত দিয়েছে।
সে টাকা তুলে নিল, কাগজে লিখল ‘‘ক্ষমা করো।’’
‘‘ইয়র্ক তোমার ক্ষমা চায় না,’’ বুড়ো ইয়র্ক বলল, ‘‘তুমি তো ইয়র্কের উপকার করেছ, ইয়র্কের উচিত তোমার ঋণ শোধ করা।’’
‘‘আবার এগোও, সেই বীজের থলে সম্পর্কে আর কিছু জানো? ভিতরে কী গাছের বীজ ছিল?’’
‘‘সম্ভবত এক ধরনের সাদা আভাময় শৈবাল, যা বাইরে জাদু শক্তি ছড়ায়, খুবই অদ্ভুত গাছ।’’
দুজনেই সামান্য মুহূর্তের বিভ্রান্তি কাটিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিল।
ভিড মনে পড়ল মৃতদেহের পায়ে থাকা বুটের কথা—প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। সে আরেকটি ছবি আঁকল—গাছগাছড়া দিয়ে তৈরি লম্বা বুট, গবলিনকে দেখাল।
বুড়ো ইয়র্ক গভীর চিন্তায় ডুবে গেল, গিয়ে বইয়ের তাক থেকে মোটা একখানা বই নামাল।
‘‘প্রাচীন পুরাণসমগ্র’’—বইয়ের মলাটে এ নাম লেখা।
‘‘কিংবদন্তির রৌপ্যচাঁদ পরীরা, যারা চাঁদের আলোয় জন্ম নেওয়া দেবী ড্রাগনের সেবা করত, স্নিগ্ধ ড্রাগন, রাতের আকাশে মেঘ ছুঁয়ে যায়, সে পরীদের মতই সুন্দর, তার আঁশ স্বপ্নময় দীপ্তি ছড়ায়, তার সামনে সব জাদু হয়ে যায় সাধারণ, আর সব অশুভ ধ্বংস হয়ে যায়।
‘‘যখন সে ড্রাগন ঘুমায়, রৌপ্যচাঁদ পরীরা গান গায়, পবিত্র জলে স্নান করায় মন্দিরের জ্যোতির্ময় বনভূমিকে।
‘‘এই দেবী ড্রাগন ও রৌপ্যচাঁদ পরীদের গল্প, বহু পুরোনো, প্রায় বিস্মৃত এক পুরাণ।’’
গবলিন বলল, ‘‘আসলে কেউ জানে না তারা সত্যিই ছিল কিনা। তুমি কি কোনো কল্পকাহিনির বইয়ে এসব ছবি দেখেছো, নাকি কোথাও সত্যিই এমন পোশাক ও অলংকার দেখেছো?’’
‘‘ইয়র্ক তোমাকে নিরুৎসাহিত করতে চায় না, তবে মনে হয়, তুমি যা দেখেছো, সেটা কোনো বিলুপ্ত বা চলে যাওয়া পরী গোষ্ঠীর নাট্য-পরিচ্ছদ।
‘‘অনেক পরী বসতিতে, পূর্ণিমায় তারা হাতে তৈরি পোশাক পরে, রৌপ্যচাঁদ পরী ও দেবী ড্রাগনের কাহিনি অভিনয় করে, নাচে। আভাময় শৈবাল অনেক সাধারণ, ইয়র্ক তো জানে অন্তত এগারো রকম পাওয়া যায়—যেমন হিমক্রিস্টাল শৈবাল, অলোক শৈবাল—সব তোমার বর্ণনার সাথে মেলে, মন্দিরের জ্যোতির্ময় বনভূমির সাথে যুক্ত নয়।
‘‘তুমি বেশি আশা করো না ভালো হয়, ওটা ওরা নাটকে ব্যবহার করে, আসল কোনো ঐতিহাসিক বস্তু নয়।’’
‘‘ঠিকই বলেছো, ওটা বেশ জীর্ণ, কোনো বনে পেয়েছিলাম মাত্র,’’ ভিড লিখল।
‘‘তাহলে তো আরোই কিছু নয়, কোনো রৌপ্যচাঁদ পরীর উপাসক হলে, তার পোশাক কখনই বাইরে পরে থাকবে না। তুমি যদি বলত, কোনো ভূগর্ভস্থ কবর কিংবা ভ্রমণভবনে পেয়ে গেছো, তাহলে হয়তো কিছুটা বিশ্বাস করতাম, কিন্তু বনে কেবল নাটকের পোশাক।’’
‘‘তোমার উত্তরের জন্য কৃতজ্ঞ, সব বুঝে গেছি,’’ ভিড লিখল।
‘‘আর কিছু জানতে চাও?’’ গবলিন মাথা নাড়ল।
‘‘শেষ একটা প্রশ্ন—জাদুময় অলংকার ব্যবহার করা যায় কীভাবে?’’ ভিড লিখল।
‘‘সাধারণত মন্ত্রজ্ঞরাই জাদুময় অলংকার ব্যবহার করতে পারে, অলংকারের জাদু সক্রিয় করতে হলে, মালিকের কমপক্ষে কিছু জাদু শক্তি থাকা চাই। তবে খুব বিরল, সাধারণ মানুষও ব্যবহার করতে পারে এমন অলংকার আছে—তা খুবই দামী, নির্দিষ্ট মন্ত্র বা শব্দ বলে, বা চাপ দিয়ে সক্রিয় হয়।’’
গবলিন আরও কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলল, সাধারণত এসব অলংকার একবার ব্যবহারেই শেষ, ঠিক যেমন সহজ–ব্যবহারযোগ্য জাদুমন্ত্রের গ্রন্থি, পঞ্চাশবার ব্যবহার করা গেলেই সেটি উন্নত মানের, আর যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তি সঞ্চার হয়ে পুনরায় জাদু ছড়াতে পারে—সে রকম আংটি তো উত্তরাধিকারী সম্পদ, বাজারে প্রায় পাওয়া যায় না।