অধ্যায় আটাশ: স্বপ্ন থাকলে সাহস করে এগিয়ে যাও

চলচ্চিত্রের মহারথী রোবট ওয়ালি 3058শব্দ 2026-03-18 19:46:30

এই তিনটি দিন যেন চিরন্তন মনে হচ্ছিল ইয়েওয়ে ও তাঁর সঙ্গীদের কাছে, আবার রোন ইয়েক্সা, আলবার্ট বার্জারসহ পুনঃক্রয় দলের সদস্যদেরও কাছে।
স্বপ্নপূরণ সংঘ অপেক্ষায় ছিল, আর পুনঃক্রয়কারী দল ছিল দ্বিধা, যন্ত্রণায়—ইয়েক্সা দু’জনে সত্যিই ‘সূর্যের কন্যা’র গল্পটি পছন্দ করেছিলেন, তবে শুধু পছন্দ করলেই তো হয় না—তাঁরা বহু চিত্রনাট্য পছন্দ করেন, কিছু দৃশ্যায়নের উপযুক্ত, কিছু শুধুই কথায় ভালো লাগে, আর ‘সূর্যের কন্যা’ যেন এই দুইয়ের মাঝামাঝি।
সবশেষে, তাঁরা নিশ্চিত হতে পারছিলেন না, বিশেষত যখন জানতে পারলেন হঠাৎ আগত ক্রেতা একজন পনেরো বছরের ধনী স্কুলছাত্র, যার পরিবার সদ্য একটি জঘন্য হাস্যরসাত্মক ছবি বানিয়েছে।
তাহলে কি এটাই ‘সূর্যের কন্যা’র প্রকৃত গুণমান? বড়লোকেরা অবজ্ঞা করে, অথচ এক অজ্ঞাত, শিশুসুলভ কিশোর একে রত্ন মনে করে ধরে রাখছে?
পঞ্চাশ হাজার ডলার দিতে তাঁদের সমস্যা নেই, কিন্তু তাঁরা পেশাদার নির্মাতা—এ ধরনের বহু প্রকল্প তাঁদের সামনে আসে, বাছ-বিচার না জানলে ক্যারিয়ার তো বহু আগেই শেষ হয়ে যেত।
‘সূর্যের কন্যা’—রিচার্ড, শেরিল, অলিভার, ডোয়াইন, ফ্র্যাঙ্ক, দাদা…
এমন এক অদ্ভুত পরিবার, যাদের তাঁরা যেমন ভালোবাসেন, তেমনি ঘৃণাও করেন; এমন এক প্রকল্প, যা তাঁদের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে—হয়তো… ছেড়ে দেওয়াই ভালো…
বুধবার কেটে গেল, ইয়েহাওগেন সাবধানে ২০০৩ সালের ১৯ নভেম্বরের পাতাটি ছিঁড়লেন, ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার জন্য, বন্ধুদের বললেন, ‘‘এটা বিশাল ব্যাপার—শেষ পর্যন্ত যা-ই হোক, এই ক্যালেন্ডারগুলো তোমার প্রথম পড়ে যাওয়া দাঁতের মতো! হ্যাঁ, কোনো এক ক্যালেন্ডার পরী এগুলো পাহারা দিচ্ছে—সংরক্ষণ করো।’’
বৃহস্পতিবার এল, স্বপ্নপূরণ সংঘের ক্লাবডে, সবাই খুবই উত্তেজিত—ফিল্ম প্রকল্প? না, বরং কয়েকটি মেয়ে এসেছে! লিলি আর তাঁর বান্ধবীরা—তাঁরাও বিনিয়োগকারী, লিলি দিয়েছে দশ হাজার, ত্রিস্ট, কনি ও আরও কয়েকজন দিয়েছে হাজার-দেড় হাজার করে।
লিয়েভ তো আনন্দে আত্মহারা—লিলি তো ওয়েই ভাইয়ের, কিন্তু অন্য সুন্দরীরা তো অবশ্যই তাঁর লম্বা নাকের জন্য পাগল হবে! কী দুঃখ—কাকে বেছে নেব, ত্রিস্ট না কনি?
এই ভেবে যখন সে মগ্ন, লি মিং, বাব, এমনকি চেন নো, বাদসহ আরও অনেকে মেয়েদের ঘিরে ব্যস্ত।
এরপর শুক্রবারও পার হয়ে গেল…
তিন দিনের মিলানোর সময় শেষ—পুরোপুরি শেষ—পুনঃক্রয়কারী দল কোনো মিলান করেনি!!
তাহলে, মার্টিন কিংবা ব্রাউন ডক্টর টাইম মেশিনে চড়ে ফিরে না গেলে, স্বপ্নপূরণ সংঘ ও ফোকাস ফিল্মসের সঙ্গে সই করা চুক্তি কার্যকর!!!
‘‘আমরা পেরেছি! আমরা পেরেছি!!’’
সেই রাতে ইয়েওয়ে যেন চিত্রনাট্যের অলিভারের মতো, যে আনন্দে বাড়ির ঘরে ছুটে বেড়াল—উল্লাসে চিৎকার, ‘‘আমরা পেরেছি! সূর্যের কন্যা, হে ঈশ্বর! সূর্যের কন্যা!!! সূর্যের কন্যা!!!!’’
‘‘ঘেউ ঘেউ!’’ পিছনে ছুটে আসা টোটোও আনন্দে চিৎকার করল, কিছু না জানলেও দোদো হাসতে হাসতে চিৎকার করে উঠল, ‘‘সূর্যের কন্যা!’’

‘‘হ্যাঁ!!’’ ইয়েওয়ে তাঁকে কোলে তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাসলেন, ‘‘দোদো, আমরা পেরেছি! আমরা সিনেমা বানাবো, ওহ, তোমার দাদা হবে পরিচালক! সত্যিকারের সিনেমার পরিচালক, হা হা হা—হলিউড, কেঁপে ওঠো, ওয়েই ভাই আসছে!!’’
ওপাশে ইয়েহাওগেন আর গুও ছিয়াও একে অপরকে জড়িয়ে ধরে হাসলেন, সন্তানের জন্য গর্বে মুখ উজ্জ্বল।
শনিবার এল, হার্ভার্ড-ওয়েস্টলেক জুনিয়র হাইয়ের চাঞ্চল্য অপরিবর্তিত।
গতরাতে ইয়েওয়ে সবাইকে একত্রিত হওয়ার বার্তা পাঠিয়েছিল, ক্লাস মিটিংয়ের পর তৃতীয় পিরিয়ডে, স্বপ্নপূরণ সংঘের সকল সদস্যকে একাডেমিক সেন্টারের রেনল্ডস হলে উপস্থিত হতে বলেছিল! সময় যাই হোক, ক্লাস ফেল হোক বা বদল, সবাইকেই আসতেই হবে!
ক্লাসের শেষে, একের পর এক আত্মবিশ্বাসী ছাত্র রেনল্ডস হলে রওনা দিল, উজ্জ্বল মুখ, জোরালো কণ্ঠ—যদি এ কোনো কার্টুন হতো, মাথার ওপর ভাবনার মেঘে লেখা থাকত, ‘‘আমি গর্বিত!’’
প্রত্যেক স্বপ্নপূরণ সংঘ সদস্যই ছিল গর্বিত—তারা স্কুলের সবচেয়ে কুল!
রেনল্ডস হল অনেকটা হগওয়ার্টস প্রাসাদের ডাইনিং হলের মতো, তবে এখানে গোল টেবিল, যেখানে নানা ক্লাবের আসর হয়, ছাত্ররা পড়ে, গল্প করে, খায়। আজ আর ছোট স্টোররুমে ১৬২ জন বসবে না।
ইয়েওয়ে আগেভাগে সেরা জায়গার কয়েকটি টেবিল দখল করে রেখেছিল, বারো শিষ্য কঠোর মুখে চারদিক পাহারা দিচ্ছিল, প্রধান টেবিলে চিত্রনাট্যের স্তূপ—কেউ যদি সাহস দেখায়, তারা টুকরো টুকরো করে কুচি করে দেবে, তারপর বাদ খাবে!
তবুও, সবার নজর সেই চিত্রনাট্যের দিকেই, ‘‘সূর্যের কন্যা’’ লেখা দেখেই যেন স্বপ্ন হাতছানি দিচ্ছে!
কেউ কেউ শান্তভাবে বসা ভিআইওয়াইকে জিজ্ঞাসা করল, ‘‘একটু দেখে নিতে পারি?’’ সে হেসে বলল, ‘‘ধৈর্য ধরো, সোনা তো আমাদের পকেটেই, কেউ নিতে পারবে না।’’
এই সময় লিলি ও তাঁর দলও এলেন, বিশাল চিত্রনাট্য দেখে বিস্মিত, ‘‘সবাই একেকটা পাবে?’’
‘‘এই, সুন্দরীরা, অবশেষে এলে! হাই, জেন!’’ ইয়েওয়ে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেল লিলির দিকে, যেন উষ্ণ আলিঙ্গন করতে চায়।
‘‘দূরে থাকো!’’ লিলি হেসে তাকে উপেক্ষা করল, পাশ কাটাল।
ইয়েওয়ে সঙ্গে সঙ্গে পাশের বাদকে জড়িয়ে ধরল, মাথা ঠেসে কণ্ঠে ফিসফিস, ‘‘এও তো কম কিসের?’’ সবাই হেসে উঠল, লিলি ঝাঁটিয়ে বলল, ‘‘তুমি তো একেবারে গাধা!’’ ইয়েওয়ে বাদকে ছেড়ে দিয়ে দেখল, সময় হয়ে এসেছে, সবাই প্রায় পৌঁছে গেছে, ঘোষণা দিল, ‘‘ছোট কন্যারা এসেছে, সূর্যও এসেছে, তাহলে শুরু হোক!’
সবাই ভাবল সে বুঝি বড় কোনো বক্তৃতা দেবে, সে কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে বলল, ‘‘ওহ্ ঈশ্বর, কতটা নার্ভাস লাগছে, কার্পসন স্যার কোথায়?’’
কার্পসন স্যার তো জানতেই পারেননি—তাঁকে ডাকাই হয়নি! সবার হাসি উপচে পড়ল, এমনকি বড়দের ছাড়াই এত বড় কাজ করার আনন্দই আলাদা।
ইয়েওয়ে কাশি দিয়ে ঠোঁট চাপড়ে গম্ভীর হলো, ‘‘বন্ধুরা, আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি, আমরা চিত্রনাট্য কিনে ফেলেছি! ঠিক এটাই, সোনালী স্বপ্নের কাগজে—আমরা পেরেছি! নিজেদের জন্য মিনিটখানেক হাততালি দাও!’’

রেনল্ডস হলে মুহূর্তেই উল্লাস আর করতালিতে মুখরিত—যুবতরুণ মুখগুলো উজ্জ্বল, কেউ নাচছে, কেউ লাফাচ্ছে, যেন উৎসব।
এক মিনিট পর ইয়েওয়ে হাসতে হাসতে এক কপি তুলল, প্রথম পাতাটি উল্টাতেই দেখা গেল একের পর এক নাম—তাদেরই নাম!
‘‘এখানে রয়েছে আমাদের কোম্পানির ১৬২ জন অংশীদারের নাম, অক্ষর অনুসারে! শুভেচ্ছা তোমাকে, এ-এ নামধারী! যাই হোক, ১৬২ জন নায়ক, ১৬২টি সম্মান—তোমরা এই চিত্রনাট্যকে উজ্জ্বল করেছ! তোমাদের জন্য আমি বিনীত—বিশ্বে এত সাহসী স্বপ্নবাজ আছে কে জানত!
কিছুক্ষণ পর সকলে এক কপি করে নিতে পারবে, বাড়ি গিয়ে পড়তে পারো—এটাই তোমাদের পাওনা!’’
ইয়েওয়ের কথায় সবার উল্লাস আরও বাড়ল, নতুন করে করতালি উঠতে যাচ্ছিল, সে আবার বলল, ‘‘তবে, এটিকে গোপন ডায়েরির মতো রাখো—কাউকে দেখিও না, বাড়ির লোককেও না! আমাদের গোপনতা রক্ষা করতে হবে—না হলে কয়েকদিনের মধ্যে পুরো দুনিয়ার কাছে ছড়িয়ে পড়বে, বুঝেছ?’’
‘‘ঠিক আছে’’, ‘‘বোঝা গেল’’—সবাই রাজি।
‘‘ওকে, তাহলে…’’ ইয়েওয়ে আমন্ত্রণমূলক ভঙ্গিতে বলল, ‘‘এবার প্রশ্নোত্তরের পালা—যা জানতে চাও জিজ্ঞেস করো, আমি উত্তর দেব।’’
সবাই মাথা নাড়ল—প্রশ্নটা তো বারবার ঘুরে ফিরে আসছে, চিত্রনাট্য কিনে নেবার পর আসলে কীভাবে প্রযোজনা করবে? বাজেট কত, টাকা কোথা থেকে আসবে? আবারও কি তহবিল সংগ্রহ করবে, নাকি অন্য কিছু?
তাদের নাম প্রথম পাতায় থাকল কারণ তারা ভিআইওয়াইকে বিশ্বাস করে, জানে তার পরিকল্পনা আছে—সব ঠিক হবে, তাই উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা।
‘‘তোমার প্রযোজনার পরিকল্পনা জানতে চাই, বিশেষ করে অর্থের উৎস।’’ প্রশ্ন করল লিলি—একদম গম্ভীর হাসিতে।
‘‘চমৎকার প্রশ্ন, খুবই ভালো।’’ ইয়েওয়ে তাকাল তার দিকে, আবার সবার দিকে, একটু গম্ভীর হয়ে বলল, ‘‘জানি, সম্প্রতি স্কুলে একটা কথা ছড়িয়েছে—আমরা নাকি নির্বোধ, আমি নাকি শুধু নাম করতে চিত্রনাট্য কিনেছি, পরে কী হবে ভেবেই দেখিনি।
তারা বলে, আমরা কোনোদিন সত্যিকারের সিনেমা বানাতে পারব না, মাঝপথে ছেড়ে দেব, আর ঝাং দা-রা চুইংগাম চিবাতে গিয়ে মুখ বিকৃত করে হাসবে। শুধু ওরা নয়, ফোকাস ফিল্মসও তাই ভাবছে, চুক্তিতে নানা শর্ত জুড়ে দিয়েছে, মনে করছে আমরা দুই বছরের মধ্যে শুধু স্ক্রিপ্ট হাতে হেসে যাব।
প্রধান শিক্ষক, বাবা-মা, এমনকি আমাদের যুক্তিবাদী, হতাশাজনক ‘নিজেদের’ কণ্ঠস্বরও—সবাই বলে, ‘তোমরা ছোটরা, কোনোদিন পারবে না।’
কিন্তু, ভাই-বোনেরা, আমার স্বপ্নের সঙ্গীরা, আমি বলছি—তারা সবাই ভুল, সম্পূর্ণ ভুল!’’