সন্তত্রিশতম অধ্যায় ভাই ড্রাগন, শুভেচ্ছা
বাম পাশে ভালো শেষ চিত্রটি আঁকা শেষ করল, সেই পুরুষটির বিকৃত হাসি দেখে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ভয়ের কমিক্স আঁকা সত্যিই কঠিন, এখন আবার সবকিছু নিয়ন্ত্রিত, ভূত নিয়ে কিছু লেখা যায় না, কুসংস্কার ছড়ানোও নিষিদ্ধ, তাই সবকিছুই যেন বাস্তব আর কল্পনার মাঝখানে। যদিও এই ঘটনাটি সত্যি অপরাধ থেকে নেওয়া, তবু বাম ভালো তার আঁকায় এমন পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেন সত্যিই কারো মধ্যে ভূত ভর করেছে, ভয়াবহ আর রহস্যময় আবহে পূর্ণ।
সে একটু প্রাণ খুলে হাঁচি দিল, রাতের খাবার কোনটা খাবে ভেবে ফোনে স্ক্রল করতে লাগল—হলুদ মাংস নাকি ফাস্টফুড, ভাতের ওপর তরকারি নাকি টক ঝাল নুডলস, দ্বিধায় ভুগছিল। ঠিক তখনই একটি অপ্রত্যাশিত ফোন এল।
‘‘হ্যালো!’’—বাম ভালো নির্লিপ্ত স্বরে বলল।
‘‘বাম পরামর্শক, এমন এক সন্দেহভাজন আছে, যিনি সবসময় কালো পোশাক পরে, মুখে কালো মাস্ক ব্যবহার করেন, আপনি কি তাকে চেনেন?’’
তান পুলিশ অফিসার অপরিচিতের মতো নির্লিপ্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলেন। যদিও এমন পোশাক খুব অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু ‘সন্দেহভাজন’ বললে সংখ্যাটা সত্যিই হাতে গোনা।
‘‘চিনি, আমার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার কাজও ওরই।’’
বাম ভালো হাসিমুখ সংগঠনের কথা বলেনি, এ বিষয়ে সে তান অফিসারকে জড়াতে চায়নি। অবশ্য, এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতাও ছিল।
‘‘তুমি ঠিক আছ তো? এখন তো নিশ্চয়ই ঠিক আছ, যখন স্বাভাবিকভাবে ফোনে কথা বলতে পারছ।’’
তান অফিসার কিছু বলতে চেয়ে থেমে গেলেন, কিন্তু উদ্বেগের কথা আগে বললেন। একটু চুপ থেকে আবার বললেন, ‘‘সে আসলে কে? কেন বারবার তোমাকে মারতে চায়?’’
‘‘আপনার উদ্বেগের জন্য ধন্যবাদ, আমি বাড়ি বদলেছি, তাই এখন ঠিক আছি। সম্ভবত, সে কোনো পুরনো মামলার সন্দেহভাজন, যাকে তদন্তকালে ক্ষেপিয়ে দিয়েছিলাম। আপনি যে ‘বারবার’ বললেন, তার মানে?’’
বাম ভালো অনেকটাই শান্ত গলায় বলল, যদিও মনে মনে জানে হয়ত সেই মানসিক রোগীর কেসের সূত্র ধরে কিছু বেরিয়েছে, তবু সে একটু অবাক হয়ে জানতে চাইল।
‘‘সেদিন সেই মানসিক রোগীকে তাড়া করে একটা বাড়িতে ঢোকা হয়েছিল, বাড়ির পুরুষ মালিককে কেউ মারধোর করে বিছানার নিচে লুকিয়ে দেয়। সে আবছা মনে করতে পারে, কালো পোশাক, মুখে মাস্ক পরা একজন আক্রমণ করেছে। বাকিটা মনে নেই।’’
‘‘ওহ, লোকটা ঠিক আছে তাতেই ভালো।’’
‘‘তুমি, সবসময় সাবধানে থেকো।’’
‘‘ঠিক আছে।’’
একটু নীরবতার পর, ‘‘টু-টু-টু’’ শব্দে ফোন কেটে গেল। বাম ভালো তখন যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরল, ফোনটা নামিয়ে রাখল। এবার সে নিশ্চিত, লোকটা সত্যিই তাকে মারার চেষ্টা করছে। এত কষ্ট করে, আসলে কেন?
‘‘ডিং ডং—’’ কারও কলিংবেল বাজল। বাম ভালো অলস গোলগাল বিড়ালটাকে একটু আদর করে উঠে গিয়ে দরজা খুলল।
‘‘বাম ভালো মহিলার সঙ্গে কথা বলছি?’’
‘‘হ্যাঁ, আমিই।’’
‘‘আপনার খাবার পৌঁছে গেল, সঙ্গে বিনামূল্যে পানীয়।’’
‘‘ধন্যবাদ, কষ্ট করলেন।’’
‘‘কিছু না, বিদায়, আরাম করে খান।’’
বাহিরের লোক চলে যাওয়ার পর, বাম ভালো খাবারের বাক্স হাতে ঘরে ফিরল। ঠিক তখনই দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিল, হঠাৎ সামনের বাড়ি থেকে এক পুরুষ বিস্মিত স্বরে বলল, ‘‘আচ্ছা, আপনি বাম ভালো?’’
‘‘আপনি আমাকে চেনেন?’’—বাম ভালো দরজা ছেড়ে, অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
ছেলেটির বয়স বিশের মাঝামাঝি, গায়ে সাদা অ্যাপ্রন, উচ্চতা প্রায় একশ পঁচাত্তর, গড়ন সরু, সাদাটে, চশমা পরা, বেশ ভদ্র-ভদ্র। সে নিজের ঘরের দরজা খুলে, হাতে কালো ব্যাগ নিয়ে, সম্ভবত ময়লা ফেলতে যাচ্ছিল।
‘‘হা হা, চিনি না, নামটা মজার লেগেছে আর দেখলাম আপনি নতুন এসেছেন, তাই একটু কথা বলতে এলাম।’’
ছেলেটি একটু অস্বস্তিতে হেসে, মাথার পেছনে হাত বুলাল। তার সরল-সোজা চেহারা দেখে বাম ভালোও না চেয়ে পারল না ছেলেটির চোখের দিকে তাকাতে।
‘‘কি মিষ্টি মেয়েটি! সত্যিই আদুরে! যদি বাড়িতে নিতে পারতাম।’’
বাম ভালো মুখে কোনো ভাব দেখাল না, চোখ একটু কুঁচকে শান্ত গলায় বলল, ‘‘তোমার নাম কী?’’
‘‘ওহ, নিজের পরিচয় দিতেই ভুলে গিয়েছিলাম। আমি একজন বাড়ি ডিজাইনার, নাম ড্রাগন ইউয়ান, বয়স পঁচিশ, সম্ভবত তোমার চেয়ে বড়। আমাকে ড্রাগন দাদা বলতে পারো। হা হা!’’
ছেলেটি আবার সেই সহজ সরল হাসি হাসল, খানিকটা বোকাসোনা, ঠিক ছোটবেলার দুষ্টু কুকুরটার মতো। বাম ভালোও তাই হাসল। আসলে, কারো হাসি সত্যিই সংক্রামক হয় কখনও কখনও।
‘‘ড্রাগন দাদা, তুমি কী ময়লা ফেলার জন্য যাচ্ছ?’’
‘‘হ্যাঁ, আগে যাও, আমি খেতে বসব।’’
বাম ভালো মনে মনে হাসল, ছেলেটার নাম শুনে মনে হচ্ছে কোনো গ্যাংস্টার, যেন পরের মুহূর্তেই বলবে, ‘‘ড্রাগন দাদা, আমাদের এলাকা দখল করে নিয়েছে!’’
তারপর ড্রাগন দাদা সবাইকে নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়বে, শুধু নিজের এলাকার দখল নেওয়ার জন্য।
এমন ভাবতে ভাবতে বাম ভালো বুঝল, তার ছোট গল্পের জন্য নতুন আইডিয়া এসেছে।
‘‘এটা কি খাবার? এত ছোট বয়সে বারবার বাইরের খাবার খাওয়া ঠিক না, শরীরের জন্যও ভালো না, কোনো পুষ্টিও নেই। চলো, আমার সঙ্গে খেতে চলো, আজ আমার জন্মদিন, বেশি রান্না করেছি, একা খেয়ে শেষ করতে পারব না, তুমি না এলে নষ্ট হবে।’’
ড্রাগন দাদা আন্তরিকভাবে বাম ভালোকে ধরে টানতে লাগল, যেন তাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গিয়ে খাওয়াবে।
‘‘না, আরেকদিন হবে। আমার কেনা খাবারটা নষ্ট হবে, আমি নিজের ঘরে খেয়ে নিই। আর হ্যাঁ, শুভ জন্মদিন, এটা তোমার জন্য, আমি খেতে যাচ্ছি।’’
বাম ভালো শক্ত করে ছেলেটির হাত ছাড়িয়ে, তার হাতে বিনামূল্যে পাওয়া টকজাম জুসের বোতল গুঁজে দিয়ে ঘরে ঢুকে, ‘‘ঠাস’’ করে দরজা বন্ধ করল।
“পাশের বাড়ির লোক অতিরিক্ত আন্তরিক হওয়াও ভালো নয়। তার জন্মদিন বলে আমার কী!”—বাম ভালো মনে মনে ভাবল। খাবারের বাক্সটা ছুঁয়ে দেখল, ভাগ্যিস, এখনও গরম। আর একটু কথা বললে ঠান্ডা হয়ে যেত, এবার সময়মতো ঢুকতে পেরেছে।
………………………………… দৃশ্যান্তর …………………………………
“তুমি কি আছ?”
“হুম।”
“০০১ শিগগিরই কাজ শুরু করবে, ০০৩ তুমি কি যোগ দেবে? আরও মজার হবে!”
“হুম, পারি। ওই মহিলা পরামর্শকের পেছনে আর লাগো না, পরবর্তী লক্ষ্য খুঁজো, আমাদের হাতে সময় কম।”
“ঠিক আছে।”
কম্পিউটারে আরেকটা এক্স চিহ্নের অ্যাভাটারে তাকিয়ে, পুরুষটি অবজ্ঞার হাসি হাসল। কেউ যদি তাকে উসকায়, সে ছেড়ে কথা বলবে না।
ধীরে ধীরে সে কালো মাস্ক খুলল, মুখ ভর্তি ঘা-পুঁজে ঢাকা, দেখতে ঘৃণ্য। নিজের থুতনিতে হাত বুলিয়ে, আস্তে আস্তে মানুষের চামড়ার মুখোশ খুলে ফেলল, বেরিয়ে এলো আসল মুখ।
মসৃণ গালে হাত বুলিয়ে সে ফিসফিস করে বলল, ‘‘কি বাজে মানের জিনিস! আমার কোমল ত্বক নষ্ট হতে বসেছিল। এবার ওর সামনে আসল চেহারায় যাব, মজাই হবে।’’
‘‘০০১, এখন তোমার পালা :)’’
‘‘ঠিক আছে, আমার জন্য অপেক্ষা করো।’’
‘‘:)’’
ছোট মেয়ের অ্যাভাটারে বার্তা পাঠিয়ে, সে আবার আরেকজন, পুরোপুরি কালো ছবি দেওয়া অ্যাভাটারকে মেসেজ পাঠাল।
‘‘০০৩, এবার তোমার কাজ শেষ করার সময়।’’
‘‘ওহ।’’
‘‘:)’’
তার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল, এই ছেলেটা সবসময় চ্যাটে শুধু ‘ওহ’ কিংবা ‘হুম’ বলে, মোটেও মজার নয়। সে এলে অবশ্যই একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার।